কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে - কারণ ও প্রতিকার

MOHAMMAD SABBIR
0

কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে - কারণ ও প্রতিকার

(toc)

হাত বা পায়ের তালু জ্বলে যাচ্ছে? জানুন কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে। এর সঠিক কারণ, লক্ষণ, ভিটামিনের উৎস, উপকারিতা ও ক্ষতিকর দিক এবং চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এই আর্টিকেলে।


আমাদের অনেকেরই মাঝেমধ্যে হাত বা পায়ের তালুতে অস্বস্তিকর জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় এই সমস্যাটি বেশি দেখা দেয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'বার্নিং ফিট সিনড্রোম' (Burning Feet Syndrome)। এই সমস্যাটি হলে মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধার সম্মুখীন হন। অনেকেই চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে চান, আসলে কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে?


আজকের এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে, এর প্রতিকার কী, প্রাকৃতিক উৎস, এবং সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের নিয়মাবলী নিয়ে।


হাত পা জ্বালা পোড়া বা পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি কী?

শরীরের স্নায়ুতন্ত্র যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন হাত ও পায়ে জ্বালাপোড়া, ঝিনঝিন করা বা অবশ ভাব দেখা দেয়। একে পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি বলা হয়। বিভিন্ন কারণে এটি হতে পারে, তবে পুষ্টিহীনতা বা ভিটামিনের ঘাটতি এর অন্যতম প্রধান কারণ। সঠিক সময়ে কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে তা শনাক্ত করতে পারলে খুব সহজেই এর সমাধান সম্ভব।


বিস্তারিত জানুন: কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে?

মূলত বি-কমপ্লেক্স গ্রুপের ভিটামিনগুলোর অভাবেই এই সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি হয়। নিচে প্রধান ভিটামিনগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো:


ভিটামিন বি-১২ (Vitamin B12) এর অভাব

আপনি যদি প্রশ্ন করেন কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে, তবে তালিকার প্রথমেই থাকবে ভিটামিন বি-১২। এই ভিটামিন আমাদের স্নায়ুর আবরণ (Myelin Sheath) সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। শরীরে দীর্ঘদিন ভিটামিন বি-১২ এর ঘাটতি থাকলে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে হাতে-পায়ে তীব্র জ্বালাপোড়া ও সুঁই ফোটানোর মতো অনুভূতি হয়।


ভিটামিন বি-৬ (Vitamin B6) এর অভাব

ভিটামিন বি-৬ স্নায়ু সংকেত পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর অভাবেও পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি দেখা দিতে পারে। তাই কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে তা জানার পাশাপাশি ভিটামিন বি-৬ এর স্তর পরীক্ষা করাও জরুরি।


ভিটামিন বি-১ (Thiamine) এর অভাব

ভিটামিন বি-১ বা থায়ামিনের অভাবে 'বেরিবেরি' রোগ হয়, যা স্নায়ুতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে হাত ও পায়ের পেশিতে ব্যথা এবং জ্বালাপোড়া সৃষ্টি হয়।


ফলিক অ্যাসিড (Vitamin B9)

ভিটামিন বি-১২ এর মতো ফলিক অ্যাসিডও স্নায়ুর সুরক্ষায় কাজ করে। এর ঘাটতি থাকলে হাত-পা জ্বালাপোড়া করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।


লক্ষণ দেখে বুঝবেন কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে

শুধুমাত্র জ্বালাপোড়া নয়, ভিটামিনের অভাবে আরও কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেমন:

  • হাত বা পায়ের তালু গরম হয়ে যাওয়া।
  • ঝিনঝিন বা অবশ ভাব (Numbness)।
  • হাঁটার সময় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা।
  • অকারণে ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করা।
  • ত্বকের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া (রক্তশূন্যতার লক্ষণ)।

এই লক্ষণগুলো দেখলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং নিশ্চিত হওয়া উচিত কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে।


ভিটামিন যুক্ত খাবারের তালিকা ও প্রাকৃতিক উৎস

ওষুধের পাশাপাশি খাবারের মাধ্যমে ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ করা সবচেয়ে নিরাপদ। যেহেতু আমরা জেনেছি কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে, তাই সেই ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবারগুলো আমাদের খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি।


ভিটামিন বি-১২ এর উৎস: কলিজা, লাল মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, সামুদ্রিক মাছ (যেমন- টুনা, স্যামন)। যারা নিরামিষভোজী, তাদের ক্ষেত্রে এই ভিটামিনের ঘাটতি বেশি দেখা যায়, তাই তাদের সাপ্লিমেন্ট বা ফর্টিফাইড খাবার গ্রহণ করা উচিত।

  • ভিটামিন বি-৬ এর উৎস: কলা, অ্যাভোকাডো, মুরগির মাংস, পালং শাক, বাদাম।
  • ভিটামিন বি-১ এর উৎস: মটরশুঁটি, আটা বা লাল চালের ভাত, ফুলকপি, কমলা।

 

ভিটামিন সাপ্লিমেন্টের উপকারিতা

সঠিক সময়ে কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে তা নির্ণয় করে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে অনেক উপকার পাওয়া যায়।

  • স্নায়ু পুনর্গঠন: ভিটামিন বি-১২ এবং বি-কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ু মেরামত করতে সাহায্য করে।
  • জ্বালাপোড়া হ্রাস: নিয়মিত সেবনে হাত-পায়ের জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি দ্রুত কমে আসে।
  • রক্তশূন্যতা দূরীকরণ: ভিটামিন বি-১২ লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে, যা দুর্বলতা কাটায়।
  • মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি: স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে এবং মানসিক অবসাদ দূর করতে সহায়তা করে।


ভিটামিন সাপ্লিমেন্টের ক্ষতিকর দিক ও সতর্কতা

যদিও ভিটামিন শরীরের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনে সেবন করলে হিতের বিপরীত হতে পারে।


বিষক্রিয়া (Toxicity): বিশেষ করে ভিটামিন বি-৬ অতিরিক্ত মাত্রায় (প্রতিদিন ২০০ মি.গ্রা. এর বেশি) গ্রহণ করলে উল্টো স্নায়ু ড্যামেজ বা নিউরোপ্যাথি হতে পারে।

পাকস্থলীর সমস্যা: অতিরিক্ত ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া বা পেটে ব্যথা হতে পারে।

অন্যান্য ওষুধের সাথে প্রতিক্রিয়া: আপনি যদি অন্য কোনো রোগের ওষুধ খান, তবে ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট তার কার্যকারিতায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।


তাই নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে ওষুধ না কিনে, আগে জানুন কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রায় সেবন করুন।


ভিটামিন ব্যবহারের নিয়ম ও চিকিৎসা

হাত-পায়ের জ্বালাপোড়া কমাতে হলে একটি সুনির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলতে হবে:


  • রক্ত পরীক্ষা: প্রথমেই চিকিৎসকের পরামর্শে সিরাম বি-১২ (Serum B12) এবং সুগার লেভেল পরীক্ষা করে নিশ্চিত হোন। কারণ ডায়াবেটিস থাকলেও এমন সমস্যা হয়।
  • সুষম আহার: প্রতিদিনের খাবারে প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি, ফলমূল এবং প্রাণিজ প্রোটিন রাখুন।
  • ইনজেকশন বা ট্যাবলেট: ঘাটতি খুব বেশি হলে ডাক্তাররা সাধারণত ভিটামিন বি-১২ ইনজেকশন (যেমন- নিউরোবি) বা ট্যাবলেট খাওয়ার পরামর্শ দেন। সাধারণত ১-৩ মাস পর্যন্ত এই কোর্স চলতে পারে।
  • লাইফস্টাইল পরিবর্তন: ধূমপান ও মদ্যপান স্নায়ুর ক্ষতি করে, তাই এগুলো বর্জন করতে হবে।


পরিশেষে বলা যায়, হাত-পায়ের জ্বালাপোড়া কোনো সাধারণ সমস্যা মনে করে অবহেলা করা উচিত নয়। দীর্ঘমেয়াদী স্নায়ুর ক্ষতি থেকে বাঁচতে সচেতনতা জরুরি। আশা করি, এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনারা জানতে পেরেছেন কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে এবং এর প্রতিকার কী।


শরীরে ভিটামিন বি-১২, বি-৬ এবং বি-১ এর ভারসাম্য বজায় রাখলে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তাই সুষম খাবার খান এবং সুস্থ থাকুন। মনে রাখবেন, সঠিক রোগ নির্ণয়ই সুস্থতার প্রথম ধাপ। আপনার যদি মনে হয় আপনি এই সমস্যায় ভুগছেন, তবে আজই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে জানুন আপনার শরীরে কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে।


মানুষজনের গুগুলে করা কিছু প্রশ্নঃ

প্রশ্নঃ শুধুমাত্র কি ভিটামিনের অভাবেই হাত পা জ্বালা করে?
উত্তরঃ না, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, থাইরয়েড সমস্যা বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণেও এটি হতে পারে। তবে ভিটামিন বি-১২ এর অভাব অন্যতম প্রধান কারণ।

প্রশ্নঃ কতদিন ভিটামিন ওষুধ খেতে হয়?
উত্তরঃ এটি নির্ভর করে আপনার শরীরে ভিটামিনের ঘাটতি কতটা তার ওপর। সাধারণত ১ থেকে ৩ মাস ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

উত্তরঃ ঘরোয়া উপায়ে কি জ্বালাপোড়া কমানো যায়?
উ: অ্যাপেল সিডার ভিনেগার মেশানো গরম পানিতে পা ভিজিয়ে রাখা, ঠাণ্ডা পানির সেঁক দেওয়া এবং ম্যাসাজ কিছুটা আরাম দিতে পারে। তবে মূল কারণ অর্থাৎ কোন ভিটামিনের অভাবে হাত পা জ্বালা পোড়া করে তা জেনে চিকিৎসা নেওয়াই স্থায়ী সমাধান।


আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাপশন সহ ইত্যাদি দেখতে চান তাহলে আমাদের এই সাইটি ভিজিট করতে পারেন। আমাদের অন্য একটি সাইট ভিজিট করতে 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top