সুন্দর ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুল সবারই কাম্য। কিন্তু বর্তমান সময়ে আবহাওয়া, দূষণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে চুলের নানা সমস্যা দেখা দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিরক্তিকর এবং সাধারণ সমস্যা হলো খুশকি। এটি শুধু মাথার ত্বকের ক্ষতিই করে না, বরং লোকসমাজে লজ্জার কারণও হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই চুল পড়া ও খুশকি দূর করার উপায় খুঁজে ক্লান্ত। আপনি যদি চিরতরে খুশকি দূর করার উপায় এবং সঠিক পরিচর্যা সম্পর্কে জানতে চান, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
খুশকি বা ড্যানড্রাফ হলো মাথার ত্বকের মৃত কোষ যা সাদা আঁশের মতো ঝরে পড়ে। এটি নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। শুরুতে এটি সাধারণ সমস্যা মনে হলেও অবহেলা করলে এটি ফাঙ্গাল ইনফেকশন এবং তীব্র চুল পড়ার কারণ হতে পারে। খুশকি দূর করার উপায় জানা থাকলে খুব সহজেই ঘরোয়া উপাদান বা সঠিক শ্যাম্পু ব্যবহার করে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আজকের এই গাইডে আমরা ধাপে ধাপে জানব কীভাবে মাথার খুশকি ও চুলকানি দূর করার উপায় গুলো প্রয়োগ করে সুস্থ চুল পাওয়া যায়।
মাথায় খুশকি কেন হয়?
শুষ্ক ত্বক: শীতকালে বা আবহাওয়ার কারণে মাথার ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে গেলে খুশকি দেখা দেয়। সেবোরিক ডার্মাটাইটিস: এটি এক ধরনের চর্মরোগ যার ফলে ত্বক তৈলাক্ত ও লালচে হয়ে যায় এবং সাদা বা হলুদ আঁশ ওঠে। ফাঙ্গাল ইনফেকশন: ম্যালাসেজিয়া (Malassezia) নামক এক ধরনের ছত্রাক মাথার ত্বকে বাস করে। এটি বেড়ে গেলে ত্বকের কোষ দ্রুত মারা যায় এবং খুশকি তৈরি করে। অপরিচ্ছন্নতা: নিয়মিত চুল না ধুলে তেল ও ময়লা জমে খুশকি সৃষ্টি হয়। মানসিক চাপ ও খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং ভিটামিন বি ও জিংকের অভাবও খুশকির জন্য দায়ী।
ছেলেদের চুলের খুশকি দূর করার উপায়
নিয়মিত চুল পরিষ্কার: ছেলেরা যেহেতু বেশি সময় বাইরে থাকে, তাই ধুলোবালি বেশি জমে। সপ্তাহে অন্তত ৩-৪ দিন অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হবে। ছোট চুল রাখা: খুশকির প্রকোপ বেশি হলে কিছুদিনের জন্য চুল ছোট রাখলে মাথার ত্বকে বাতাস লাগে এবং ফাঙ্গাস কমে যায়। নারকেল তেল ও কর্পূর: নারকেল তেলের সাথে সামান্য কর্পূর মিশিয়ে মাথায় ম্যাসাজ করলে ছেলেদের জেদি খুশকি দ্রুত দূর হয়। জেল বা স্প্রে পরিহার: চুলে অতিরিক্ত স্টাইলিং জেল ব্যবহার করলে তা জমে খুশকি তৈরি করে, তাই এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।
মেয়েদের মাথার খুশকি দূর করার শ্যাম্পু
জিংক পাইরিথিয়ন (Zinc Pyrithione): এটি ফাঙ্গাস ও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সাহায্য করে। কিটোকোনাজল (Ketoconazole): এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-ফাঙ্গাল উপাদান যা তীব্র খুশকি ও চুলকানি কমায়। সেলেনিয়াম সালফাইড: এটি কোষের মৃত্যুর হার কমিয়ে খুশকি নিয়ন্ত্রণ করে।
লেবু দিয়ে খুশকি দূর করার উপায়
লেবুর রস ও পানি: ২ টেবিল চামচ লেবুর রসের সাথে ১ কাপ পানি মিশিয়ে চুলে ম্যাসাজ করুন। ৫-১০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এটি প্রতিদিন করলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়। লেবু ও দই: টক দইয়ের সাথে লেবুর রস মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এটি মাথায় লাগিয়ে ২০ মিনিট রাখুন। এটি চুল পড়া ও খুশকি দূর করার উপায় হিসেবেও দারুণ কার্যকরী। লেবু ও নারকেল তেল: কুসুম গরম নারকেল তেলের সাথে লেবুর রস মিশিয়ে রাতে মাথায় ম্যাসাজ করুন এবং সকালে ধুয়ে ফেলুন।
মাথার খুশকি ও চুলকানি দূর করার উপায়
আপেল সাইডার ভিনেগার: সমপরিমাণ পানি ও আপেল সাইডার ভিনেগার মিশিয়ে স্প্রে বোতলে নিন। শ্যাম্পু করার আগে এটি মাথায় স্প্রে করে ১৫ মিনিট রাখুন। এটি চুলকানি কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। নিম পাতার পেস্ট: নিম পাতা এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণসমৃদ্ধ। নিম পাতা বেটে মাথায় লাগালে চুলকানি ও খুশকি দুই-ই কমে। টি ট্রি অয়েল (Tea Tree Oil): আপনার রেগুলার শ্যাম্পুর সাথে কয়েক ফোঁটা টি ট্রি অয়েল মিশিয়ে ব্যবহার করলে মাথার ত্বকের ইরিটেশন বা চুলকানি কমে যায়।
চুল পড়া ও খুশকি দূর করার উপায়
মেথির প্যাক: মেথি সারারাত ভিজিয়ে রেখে সকালে বেটে পেস্ট তৈরি করুন। এটি মাথায় লাগিয়ে ৩০ মিনিট রাখুন। এটি খুশকি দূর করার পাশাপাশি নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। পেঁয়াজের রস: পেঁয়াজের রসে সালফার থাকে যা চুলের গোড়া মজবুত করে এবং খুশকি বিনাশ করে।
চিরতরে খুশকি দূর করার উপায়
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন। জিংক এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার (যেমন—সামুদ্রিক মাছ, বাদাম, ডিম) ডায়েটে যুক্ত করুন। চিরুনি ও বালিশ পরিষ্কার: অন্যের চিরুনি ব্যবহার করবেন না। নিজের চিরুনি ও বালিশের কভার নিয়মিত গরম পানি ও স্যাভলন দিয়ে পরিষ্কার করুন। মানসিক চাপ কমানো: স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তা খুশকি বাড়িয়ে দেয়। তাই নিয়মিত যোগব্যায়াম বা মেডিটেশন করুন। নিয়মিত তেল ম্যাসাজ: সপ্তাহে অন্তত একদিন উষ্ণ তেল ম্যাসাজ করলে মাথার ত্বকের রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং ত্বক স্বাস্থ্যকর থাকে।
খুশকি দূর করার শ্যাম্পু বাংলাদেশ
হেড অ্যান্ড শোল্ডার্স (Head & Shoulders): কুল মেন্থল বা লেমন ফ্লেভারগুলো খুশকি ও চুলকানি কমাতে বেশ জনপ্রিয়। ক্লিয়ার (Clear): ছেলেদের এবং মেয়েদের জন্য আলাদা ভেরিয়েন্ট রয়েছে যা স্ক্যাল্পের গভীরে গিয়ে কাজ করে। নিজোরল (Nizoral): এটি একটি মেডিকেটেড শ্যাম্পু যাতে কিটোকোনাজল থাকে। অতিরিক্ত খুশকির জন্য ডাক্তাররা এটি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। সিলেক্ট প্লাস (Select Plus): এটিও ফার্মেসিতে পাওয়া যায় এবং ফাঙ্গাল ইনফেকশন দূর করতে খুব ভালো কাজ করে। বায়োজিন বা আয়ুর্বেদিক শ্যাম্পু: যারা কেমিক্যাল এড়াতে চান, তারা বিভিন্ন হারবাল বা আয়ুর্বেদিক শ্যাম্পু ব্যবহার করতে পারেন যা বাংলাদেশে সহজলভ্য।
কিছু সতর্কতা
- নখ দিয়ে মাথা চুলকাবেন না। এতে মাথার ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে এবং ইনফেকশন বেড়ে যেতে পারে।
- লেবু বা ভিনেগার ব্যবহারের পর সরাসরি কড়া রোদে যাবেন না।
- মেডিকেটেড শ্যাম্পু (যেমন নিজোরল) ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘ দিন ব্যবহার করবেন না।
- যদি ঘরোয়া পদ্ধতি বা শ্যাম্পু ব্যবহারে এক মাসের মধ্যে কোনো উন্নতি না হয় এবং মাথায় চাকা চাকা দাগ বা রক্তপাত হয়, তবে দ্রুত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। এটি সোরিয়াসিস বা একজিমার লক্ষণ হতে পারে
- আরো দেখুন: চুল লম্বা করতে মেথির ব্যবহার ও তেলের নাম
- আরো দেখুন : শীতে শুষ্ক ত্বকের যত্নে ঘরোয়া উপায়
- আরো দেখুন: ঘাড় ও মাথা ব্যথার কারণ ও প্রতিকার | ১০টি ঔষধের
