সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা - সঠিক ব্যবহারের নিয়ম

MOHAMMAD SABBIR
0

সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা - সঠিক ব্যবহারের নিয়ম
(toc) #title=(Table of Content)

বাঙালি রান্নাঘর আর সরিষার তেল যেন একে অপরের পরিপূরক। ঝালমুড়ি মাখানো থেকে শুরু করে ইলিশ মাছের ঝোল—সরিষার তেলের ঝাঁঝালো গন্ধ ছাড়া আমাদের রসনা তৃপ্তি পায় না। প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দাদি-নানিরা শুধু রান্নায় নয়, শরীরের নানা উপকারেও এই তেল ব্যবহার করে আসছেন। তবে কোনো কিছুরই অতিরিক্ত ব্যবহার ভালো নয়। তাই সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা উভয় দিক সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

আজকের এই ব্লগে আমরা সরিষার তেলের পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং এর কিছু সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

আরো দেখুনঃ ওজন কমাতে চিয়া সিড খাওয়ার নিয়ম

সরিষার তেলের পুষ্টিগুণ

সরিষার তেলে রয়েছে ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের এক চমৎকার ভারসাম্য। এতে প্রচুর পরিমাণে মনোআনস্যাচুরেটেড এবং পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যা হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী। এছাড়াও এতে ভিটামিন ই, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের উপস্থিতি একে অন্যান্য তেলের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।

সরিষার তেলের উপকারিতা

সরিষার তেলের উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না। এটি যেমন অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়, তেমনি বাহ্যিক রূপচর্চায়ও এর ভূমিকা অতুলনীয়। নিচে এর প্রধান উপকারিতাগুলো তুলে ধরা হলো:

  • হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে

সরিষার তেলে থাকা মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা কমিয়ে ভালো কোলেস্টেরলের (HDL) মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে এটি নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

  • ঠান্ডা ও সর্দি-কাশি উপশমে

শীতকালে বা ঋতু পরিবর্তনের সময় সর্দি-কাশি হওয়া সাধারণ ব্যাপার। এই সময়ে সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে কথা বললে এর নিরাময় ক্ষমতার কথা আগে আসে। হালকা গরম সরিষার তেল বুকে ও পিঠে মালিশ করলে বন্ধ নাক খুলে যায় এবং কফ পরিষ্কার হয়। এছাড়া কালো জিরা ও রসুন দিয়ে গরম করা সরিষার তেল মালিশ করলে শরীরের ব্যথা ও ঠান্ডা দ্রুত সেরে যায়।

  • হজম শক্তি বৃদ্ধিতে

সরিষার তেল পাকস্থলীর গ্যাস্ট্রিক জুস উদ্দীপিত করে, যা হজম প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এটি ক্ষুধা বাড়াতেও সাহায্য করে। যারা হজমের সমস্যায় ভোগেন, তারা রান্নায় সরিষার তেল ব্যবহার করে দেখতে পারেন।

  • প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে

বাতের ব্যথা বা পেশির ব্যথায় সরিষার তেল মালিশ দারুণ কার্যকর। এতে থাকা সেলেনিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম প্রদাহবিরোধী উপাদান হিসেবে কাজ করে, যা শরীরের জয়েন্টের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।

  • ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে

গবেষণায় দেখা গেছে, সরিষার তেলে থাকা ‘গ্লুকোসিনোলেট’ নামক উপাদান কোলন ও পরিপাকতন্ত্রের ক্যান্সার কোষ গঠনে বাধা দেয়। এর শক্তিশালী অ্যান্টি-কার্সিনোজেনিক বৈশিষ্ট্য শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

  • ত্বকের যত্নে সরিষার তেল

সরিষার তেল একটি প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন হিসেবে কাজ করে। এতে প্রচুর ভিটামিন ই রয়েছে, যা ত্বকের বলিরেখা দূর করে এবং ত্বককে উজ্জ্বল রাখে। নারকেল তেলের সাথে সামান্য সরিষার তেল মিশিয়ে ত্বকে মালিশ করলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং ত্বক টানটান থাকে।

  • চুলের বৃদ্ধিতে ও খুশকি দূর করতে

চুলের গোড়া মজবুত করতে এবং অকালপক্বতা রোধে সরিষার তেল যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে থাকা বিটা-ক্যারোটিন চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। সপ্তাহে অন্তত দুদিন সরিষার তেল মাথায় মালিশ করলে খুশকি দূর হয় এবং চুল ঝলমলে হয়।

আরও দেখুনঃ চুল লম্বা করতে মেথির ব্যবহার ও তেলের নাম

সরিষার তেলের অপকারিতা

সরিষার তেলের যেমন অসংখ্য গুণ রয়েছে, তেমনি এর কিছু ক্ষতিকর দিক বা অপকারিতাও রয়েছে। বিশেষ করে ভুল পদ্ধতিতে বা অতিরিক্ত ব্যবহারে সমস্যা হতে পারে। নিচে সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা আলোচনার এই অংশে ক্ষতিকর দিকগুলো উল্লেখ করা হলো:

  • ইরুসিক অ্যাসিডের প্রভাব

সরিষার তেলে উচ্চমাত্রায় ‘ইরুসিক অ্যাসিড’ (Erucic Acid) থাকে। দীর্ঘকাল ধরে এই অ্যাসিড শরীরের প্রবেশ করলে হৃদপিণ্ডের পেশির ক্ষতি হতে পারে বলে কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। এই কারণেই অনেক উন্নত দেশে সরিষার তেল শুধুমাত্র মালিশের জন্য অনুমোদিত, রান্নার জন্য নয়। তবে খাঁটি এবং সঠিক মাত্রায় ব্যবহারে এটি ততটা ক্ষতিকর নয়।

  • অ্যালার্জির সমস্যা

সবার ত্বক সমান হয় না। অনেকের সরিষার তেল ত্বকে ব্যবহার করলে র‍্যাশ, চুলকানি বা লালচে ভাব দেখা দিতে পারে। তাই সরাসরি মুখে বা সংবেদনশীল ত্বকে ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট করে নেওয়া জরুরি।

  • গর্ভবতী মহিলাদের জন্য সতর্কতা

গর্ভাবস্থায় সরিষার তেলের অতিরিক্ত ব্যবহার অনেক সময় গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে থাকা কিছু রাসায়নিক উপাদান জরায়ুর সংকোচন ঘটাতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় সরিষার তেল খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

  • শিশুদের সংবেদনশীল ত্বকে ব্যবহার

অনেকে নবজাতক শিশুদের সরিষার তেল মালিশ করেন। তবে শিশুদের ত্বক অত্যন্ত কোমল হওয়ার কারণে সরিষার তেলের তীব্রতা তাদের ত্বকে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে গরমকালে শিশুদের গায়ে সরিষার তেল মাখানো থেকে বিরত থাকা ভালো।

  • ড্রপসি রোগের ঝুঁকি

অসাধু ব্যবসায়ীরা অনেক সময় সরিষার তেলের সাথে শেয়ালকাঁটার বীজের তেল (Argemone oil) মিশিয়ে দেয়। এই ভেজাল তেল খেলে 'ড্রপসি' নামক মারাত্মক রোগ হতে পারে, যা শরীরের বিভিন্ন অংশে জল জমার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

খাঁটি সরিষার তেল চেনার উপায়

যেহেতু আমরা সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে জানছি, তাই খাঁটি তেল চেনার উপায় জানাটা খুব জরুরি। ভেজাল তেল স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

  • গন্ধ: খাঁটি সরিষার তেলের ঝাঁঝালো গন্ধ থাকবে যা নাকে লাগলে হালকা অস্বস্তি হতে পারে।
  • রঙ: খাঁটি তেলের রঙ গাঢ় সোনালি বা লালচে আভা যুক্ত হয়।
  • ঠাণ্ডা পরীক্ষা: একটি পাত্রে কিছুটা তেল নিয়ে ফ্রিজে রাখুন। যদি নিচে সাদা কোনো স্তর জমা হয়, তবে বুঝবেন এতে ভেজাল আছে।

রান্নায় সরিষার তেল ব্যবহারের সঠিক নিয়ম

রান্নায় সরিষার তেলের পূর্ণ স্বাদ ও গুণাগুণ পেতে হলে এটি উচ্চ তাপে ফুটানো উচিত নয়। হালকা আঁচে রান্না করলে এর পুষ্টিগুণ বজায় থাকে। এছাড়া কাঁচা সরিষার তেল ভর্তা বা সালাদে ব্যবহার করলে এটি শরীরের মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে।

পরিশেষে বলা যায়, সরিষার তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা দুটোই বিদ্যমান। তবে এর উপকারিতার পাল্লাই বেশি ভারী। আমরা যদি খাঁটি সরিষার তেল নির্বাচন করতে পারি এবং পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করি, তবে এটি আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য আশির্বাদ হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, যাদের নির্দিষ্ট কোনো শারীরিক সমস্যা বা অ্যালার্জি আছে, তাদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।

আশা করি, আজকের এই ব্লগটি পড়ে আপনি সরিষার তেলের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছেন। সুষম খাদ্য হিসেবে সরিষার তেলকে আপনার জীবনযাত্রার অংশ করুন এবং সুস্থ থাকুন।

বি.দ্র: স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গুরুতর কোনো সমস্যা থাকলে সরিষার তেল ব্যবহারের আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাপশন সহ ইত্যাদি দেখতে চান তাহলে আমাদের এই সাইটি ভিজিট করতে পারেন। আমাদের অন্য একটি সাইট ভিজিট করতে 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top