শসা খাওয়ার উপকারিতা: ওজন কমানো থেকে রূপচর্চা

MOHAMMAD SABBIR
0

শসা খাওয়ার উপকারিতা: ওজন কমানো থেকে রূপচর্চা

গ্রীষ্মের দাবদাহে এক টুকরো শসা যেন শরীরে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। সালাদ, স্যান্ডউইচ কিংবা শুধুই লবণ দিয়ে মেখে খাওয়া—শসা আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এটি এমন একটি সবজি (উদ্ভিদতাত্ত্বিকভাবে ফল), যা প্রায় সারা বছরই পাওয়া যায় এবং দামেও সস্তা। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে, সাধারণ এই সবজিটি পুষ্টিগুণে কতটা অসাধারণ। 

শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করা থেকে শুরু করে ওজন কমানো, এমনকি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও শসা খাওয়ার উপকারিতা অনস্বীকার্য। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা শসা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা, খাওয়ার সঠিক সময় এবং নিয়ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

শসার পুষ্টিগুণ

শসা মূলত পানিবহুল একটি খাবার। এর প্রায় ৯৫-৯৬ শতাংশই পানি। তবে পানির পাশাপাশি এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ এবং ফাইবার। এতে ক্যালোরির পরিমাণ খুবই কম, যা একে ওজন কমানোর জন্য আদর্শ খাবার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

শসা খাওয়ার উপকারিতা

নিয়মিত শসা খেলে শরীর নানাভাবে উপকৃত হয়। নিচে শসা খাওয়ার উপকারিতা গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ ও ডিহাইড্রেশন রোধ:
মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়া-বিক্রিয়া সচল রাখতে পানির বিকল্প নেই। শসায় প্রচুর পরিমাণে পানি থাকায় এটি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে গরমে বা শরীরচর্চার পর শসা খেলে শরীর দ্রুত সতেজ হয় এবং শরীর থেকে বিষাক্ত টক্সিন বের হয়ে যায়।

ওজন কমাতে সহায়ক:
যারা ওজন কমানোর মিশনে আছেন, তাদের জন্য শসা পরম বন্ধু। এতে ক্যালোরি খুব কম কিন্তু ফাইবার বা আঁশ বেশি। ফলে শসা খেলে পেট অনেকক্ষণ ভরা থাকে এবং বারবার ক্ষুধা লাগার প্রবণতা কমে। সালাদে তেলের বদলে শসা ব্যবহার করলে ক্যালোরি ইনটেক অনেকটাই কমানো সম্ভব।

রক্তচাপ ও সুগার নিয়ন্ত্রণ:
শসায় থাকা পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফাইবার উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স খুব কম, যা ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।

ত্বক ও চুলের যত্ন:
শসায় থাকা সিলিকা চুল ও নখ মজবুত করতে সাহায্য করে। এছাড়া এর ভিটামিন সি ও ক্যাফেইক এসিড ত্বকের জ্বালাপোড়া কমায়, রোদে পোড়া দাগ দূর করে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে। চোখের নিচের কালো দাগ দূর করতে শসার টুকরো ব্যবহারের প্রচলন বহুদিনের।

হজমশক্তি বৃদ্ধি:
শসায় প্রচুর পানি ও ফাইবার থাকায় এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে দারুণ কার্যকরী। যাদের নিয়মিত বাওয়েল মুভমেন্টে সমস্যা হয়, তারা নিয়মিত শসা খেলে উপকার পাবেন।

আরো পড়ুনঃ ড্রাগন ফলের উপকারিতা ও অপকারিতা

খালি পেটে শসা খাওয়ার উপকারিতা

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, শসা কখন খাওয়া সবচেয়ে ভালো? সকালে খালি পেটে শসা খাওয়ার উপকারিতা অনেক।

  • বিপাক ক্রিয়া বা মেটাবলিজম বৃদ্ধি: সকালে খালি পেটে শসা খেলে শরীরের মেটাবলিজম রেট বাড়ে, যা সারাদিন ক্যালোরি বার্ন করতে সাহায্য করে।

  • ডিটক্সিফিকেশন: সারারাত ঘুমানোর পর সকালে আমাদের শরীরে জমে থাকা টক্সিন বের করে দিতে খালি পেটে শসা বা শসার জুস দারুণ কাজ করে। এটি লিভার ও কিডনিকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।

  • এনার্জি বুস্ট: সকালে চায়ের বদলে এক গ্লাস শসার জুস আপনাকে তাৎক্ষণিক সতেজতা এবং এনার্জি দিতে পারে।

রাতে শসা খাওয়ার উপকারিতা ও সতর্কতা

শসা খাওয়ার সময় নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয় রাতের বেলা খাওয়া নিয়ে। রাতে শসা খাওয়ার উপকারিতা এবং কিছু অসুবিধাও রয়েছে।

উপকারিতা:
রাতে যারা হালকা খাবার খেতে পছন্দ করেন বা ডায়েট করছেন, তাদের জন্য শসা একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। এটি সহজপাচ্য এবং ক্যালোরি কম হওয়ায় ওজন বাড়ার ভয় থাকে না।

আরো পড়ুনঃ টমেটো খাওয়ার উপকারিতা - Tomato

সতর্কতা:

তবে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র এবং অনেক পুষ্টিবিদের মতে, রাতে শসা খাওয়া সবার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে।

শসা শরীর ঠান্ডা করে, তাই যাদের সাইনাস বা ঠান্ডা লাগার প্রবণতা আছে, রাতে শসা খেলে তাদের সমস্যা বাড়তে পারে।

শসায় প্রচুর পানি থাকে, তাই রাতে বেশি শসা খেলে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হতে পারে, যা আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

অনেকের ক্ষেত্রে রাতে কাঁচা শসা হজম হতে সময় নেয় এবং পেটে গ্যাস বা ব্লটিং-এর সৃষ্টি করতে পারে। তাই ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে খাওয়া শ্রেয়।

শসা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা

যেকোনো খাবারের মতো শসারও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। শসা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা দুটোই জেনে রাখা জরুরি।

অপকারিতা:
তিতা শসা ও বিষক্রিয়া: কিছু শসায় 'কিউকারবিটাসিন' (Cucurbitacin) নামক এক ধরনের উপাদান থাকে, যা শসাকে তিতা করে তোলে। অতিরিক্ত তিতা শসা খেলে শরীরে বিষক্রিয়া হতে পারে, পেট ব্যথা বা বমি হতে পারে। তাই শসা কাটার পর তিতা মনে হলে তা ফেলে দেওয়া উচিত।

পেট ফাঁপা বা গ্যাস: শসায় থাকা কিউকারবিটাসিন অনেকের হজমে সমস্যা করে এবং পেটে গ্যাস বা ব্লটিং তৈরি করে। একে বলা হয় 'বার্পিং' সমস্যা।

কিডনির সমস্যা: শসায় পটাশিয়াম থাকে। যাদের কিডনির গুরুতর সমস্যা আছে বা শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, তাদের অতিরিক্ত শসা খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

রক্ত জমাট বাঁধায় প্রভাব: শসায় ভিটামিন কে থাকে, যা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ (Blood Thinners) খাচ্ছেন, তাদের হঠাৎ করে শসা খাওয়ার পরিমাণ খুব বেশি বাড়ানো উচিত নয়।

সতর্কতা ও খাওয়ার নিয়ম

ভালোভাবে ধোয়া: শসার খোসায় অনেক সময় কীটনাশক বা মোমের প্রলেপ থাকতে পারে। তাই খাওয়ার আগে হালকা গরম পানি ও লবণ দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া উচিত। সম্ভব হলে খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া নিরাপদ।

তিতা অংশ বর্জন: শসার দুই প্রান্ত কেটে ঘষে নিলে তিতা ভাব কমে যায়। তবুও মুখে দিয়ে যদি অতিরিক্ত তিতা লাগে, তবে সেই শসা খাবেন না।

পরিমিত গ্রহণ: প্রতিদিন একটি বা দুটি মাঝারি আকারের শসা খাওয়াই যথেষ্ট। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়।

পরিশেষে বলা যায়, সুস্বাস্থ্য রক্ষায় শসা খাওয়ার উপকারিতা অতুলনীয়। এটি শরীরকে ঠান্ডা রাখে, বিষমুক্ত করে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে সঠিক সময়ে এবং সঠিক নিয়মে খাওয়া প্রয়োজন। খালি পেটে শসা খাওয়ার উপকারিতা যেমন রয়েছে, তেমনি রাতে খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। আপনার শারীরিক অবস্থা এবং হজমশক্তি বুঝে নিয়মিত খাদ্যতালিকায় শসা যোগ করুন এবং সুস্থ থাকুন।


আমাদের অন্য একটি সাইট ভিজিট করতে 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top