মুলা চাষ পদ্ধতি ও বর্ষাকালে মুলা চাষ পদ্ধতি ফলন পর্যন্ত

MOHAMMAD SABBIR
0

মুলা চাষ পদ্ধতি ও বর্ষাকালে মুলা চাষ পদ্ধতি ফলন পর্যন্ত

বাংলাদেশে জনপ্রিয় সবজিগুলোর মধ্যে মুলা অন্যতম। এটি সাধারণত শীতকালীন সবজি হলেও বর্তমানে উন্নত জাত ও প্রযুক্তির কল্যাণে সারা বছরই এর চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। সঠিক নিয়ম মেনে 
মুলা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করলে কৃষক ভাইয়েরা অল্প সময়ে অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারেন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সাধারণ সময়ের পাশাপাশি বর্ষাকালে মুলা চাষ পদ্ধতিহাইব্রিড মুলা চাষ পদ্ধতি এবং গ্রীষ্মকালীন মুলা চাষ পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

আরো পড়ুনঃ টমেটো খাওয়ার উপকারিতা - Tomato

মাটি ও জলবায়ু

মুলা চাষের জন্য ঝুরঝুরে ও বেলে দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। এঁটেল মাটিতে মুলা ভালো হয় না কারণ এতে মূল বা মুলা ঠিকমতো বাড়তে পারে না। মাটির পিএইচ (pH) মাত্রা ৬.০ থেকে ৭.০ এর মধ্যে থাকলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। মুলা মূলত ঠান্ডা জলবায়ুর ফসল, তবে বর্তমানে তাপ সহনশীল জাত উদ্ভাবনের ফলে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালেও এর সফল চাষ হচ্ছে।

উন্নত জাত নির্বাচন

মুলা চাষে সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো সঠিক জাত নির্বাচন। মৌসুমভেদে জাত ভিন্ন হতে পারে।

  • শীতকালীন জাত: বারি মুলা-১, বারি মুলা-২, বারি মুলা-৩, এভারেস্ট, হোয়াইট প্রিন্স ইত্যাদি।

  • গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালীন জাত: এই সময়ের জন্য তাপ ও বৃষ্টি সহনশীল জাত নির্বাচন করতে হবে। যেমন— তাসাকি, দ্রুতি, মিনো আর্লি, গ্রিন পিস ইত্যাদি।

জমি তৈরি ও সার ব্যবস্থাপনা

মুলা মাটির নিচের ফসল, তাই জমি গভীর করে চাষ দিতে হবে। মাটি একদম ঝুরঝুরে করতে হবে যাতে মুলা মাটির গভীরে সহজে প্রবেশ করতে পারে। জমি তৈরির সময় গোবর সার বা জৈব সার পর্যাপ্ত পরিমাণে মিশিয়ে দিতে হবে।

সারের পরিমাণ (প্রতি শতকে):

  • গোবর: ৪০ কেজি

  • ইউরিয়া: ১ কেজি ২-৩ কিস্তিতে

  • টিএসপি: ৮০০ গ্রাম

  • এমওপি: ৭০০ গ্রাম

  • জিপসাম ও বোরন: সামান্য পরিমাণ (মাটির উর্বরতা ভেদে)

জমি তৈরির শেষ চাষের সময় ইউরিয়া বাদে সব সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

বীজ বপন ও চারা রোপণ

মুলা চাষ পদ্ধতিতে বীজ সরাসরি জমিতে বপন করা হয়। তবে গ্রীষ্ম বা বর্ষাকালে বেড তৈরি করে বপন করা উত্তম।

  • বপন সময়: শীতকালীন মুলার জন্য আশ্বিন থেকে কার্তিক মাস উপযুক্ত। আর গ্রীষ্মকালীন মুলা চাষ পদ্ধতি অনুযায়ী ফাল্গুন থেকে চৈত্র মাসে এবং বর্ষাকালের জন্য আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বীজ বপন করতে হয়।

  • বপন দূরত্ব: সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫-৩০ সেমি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ১০-১২ সেমি রাখতে হবে। বীজ ১.৫ থেকে ২ সেমি গভীরে বুনতে হবে।

বর্ষাকালে মুলা চাষ পদ্ধতি (বিশেষ অংশ)

বর্ষাকালে মুলা চাষ করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু এতে বাজার দর অনেক বেশি পাওয়া যায়। বর্ষাকালে মুলা চাষ পদ্ধতি সফল করতে হলে অবশ্যই উঁচু জমি নির্বাচন করতে হবে যেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে না।

১. বেড পদ্ধতি: বর্ষায় সমতল জমিতে মুলা চাষ না করে বেড বা আইল পদ্ধতিতে চাষ করতে হবে। প্রতিটি বেড ৬-৮ ইঞ্চি উঁচু হতে হবে যাতে অতিরিক্ত পানি নালায় চলে যায়।
২. নিষ্কাশন ব্যবস্থা: জমির চারপাশে নালীর ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে ভারী বৃষ্টি হলেও দ্রুত পানি সরে যায়।
৩. পলিথিন শেড: অতিরিক্ত বৃষ্টি থেকে চারা বাঁচাতে পলিথিন শেড বা টানেল ব্যবহার করা যেতে পারে, যদিও এটি ব্যয়সাপেক্ষ।
৪. জাত নির্বাচন: বর্ষায় অবশ্যই মিনো আর্লি বা তাসাকি সান এর মতো জাত নির্বাচন করতে হবে যা আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে।

গ্রীষ্মকালীন মুলা চাষ পদ্ধতি

গরমকালে মুলা চাষের প্রধান সমস্যা হলো তাপমাত্রা এবং পোকার আক্রমণ। গ্রীষ্মকালীন মুলা চাষ পদ্ধতিতে চাষিদের নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে:

  • মাটিতে যেন পর্যাপ্ত রস থাকে, তাই নিয়মিত হালকা সেচ দিতে হবে।

  • মালচিং ব্যবহার করলে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা সহজ হয় এবং আগাছা কম হয়।

  • অতিরিক্ত রোদে কচি চারা পুড়ে যেতে পারে, তাই বিকেলের দিকে বীজ বপন করা ভালো।

হাইব্রিড মুলা চাষ পদ্ধতি

কম সময়ে অধিক ফলন এবং আকর্ষণীয় আকারের মুলার জন্য হাইব্রিড মুলা চাষ পদ্ধতি বর্তমানে খুব জনপ্রিয়। হাইব্রিড জাতগুলো সাধারণত ৪০-৪৫ দিনের মধ্যেই তোলার উপযোগী হয়ে যায়।

  • হাইব্রিড মুলা চাষে সারের মাত্রা দেশি জাতের চেয়ে কিছুটা বেশি লাগে।

  • রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে।

  • এই পদ্ধতিতে একর প্রতি ফলন সাধারণ জাতের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে।

অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা

১. চারা পাতলাকরণ: বীজ গজানোর ১০-১৫ দিন পর ঘন চারা তুলে ফেলতে হবে। একে ‘থিনিং’ বলে। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় না রাখলে মুলা মোটা হবে না।
২. আগাছা দমন: জমি সবসময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। আগাছা মুলার খাবার খেয়ে ফেলে এবং পোকা মাকড়ের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে।
৩. সেচ: মাটিতে রসের অভাব হলে মুলা শক্ত ও ঝাঁঝালো হয়ে যায়। তাই মাটি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। তবে মনে রাখবেন, জমিতে পানি জমলে মুলা পচে যাবে।
৪. মাটি আলগা করা: সেচ দেওয়ার পর মাটির উপরের স্তর শক্ত হয়ে গেলে নিড়ানি দিয়ে ভেঙে দিতে হবে। এতে শিকড় দ্রুত বাড়ে।

রোগ ও পোকামাকড় দমন

মুলা চাষে জাব পোকা, বিছা পোকা এবং ফ্লি বিটল পোকার আক্রমণ হতে পারে।

  • পোকা দমন: জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করা উত্তম। আক্রমণ বেশি হলে সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক সঠিক মাত্রায় স্প্রে করতে হবে।

  • রোগ: অলটারনারিয়া ব্লাইট বা পাতা ঝলসানো রোগ হতে পারে। এর জন্য ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।

ফসল সংগ্রহ

জাতভেদে বীজ বপনের ৪০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে মুলা খাওয়ার উপযোগী হয়। মুলা বেশি দিন জমিতে রাখলে এর ভেতর ফাঁপা হয়ে যায় এবং স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। তাই কচি থাকতেই মুলা তুলে ফেলা উচিত। মাটি শক্ত থাকলে হালকা সেচ দিয়ে মুলা তোলা সহজ হয়।

সতর্কতা (Warning)

মুলা চাষে ভালো ফলন পেতে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি:
১. পানি নিষ্কাশন: মুলা জলাবদ্ধতা একদম সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে বর্ষাকালে মুলা চাষ পদ্ধতি অনুসরণের সময় জমিতে যেন কোনোভাবেই পানি না জমে সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। পানি জমলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাছ পচে যেতে পারে।
২. অতিরিক্ত সার: নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া সার অতিরিক্ত ব্যবহার করলে মুলা ফেটে যেতে পারে এবং শেকড় অমসৃণ হতে পারে।
৩. দেরিতে সংগ্রহ: বাজার দর বেশি পাওয়ার আশায় মুলা বেশি দিন জমিতে রাখবেন না। এতে মুলা ফাঁপা ও তন্তুময় হয়ে বাজার মূল্য হারাবে।
৪. ঘন চারা: চারা পাতলা না করলে মুলা সরু হবে এবং ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে।

উপসংহার

মুলা একটি স্বল্পমেয়াদী লাভজনক ফসল। সঠিক পরিকল্পনা এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এর মাধ্যমে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন। বিশেষ করে হাইব্রিড মুলা চাষ পদ্ধতি এবং অফ-সিজন বা গ্রীষ্মকালীন ও বর্ষাকালে মুলা চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করলে সাধারণ সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ লাভ করা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক জাত নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ এবং নিবিড় পরিচর্যা। আশা করি, এই নির্দেশিকা অনুসরণ করে আপনারা মুলা চাষে সফল হবেন।

আমাদের অন্য একটি সাইট ভিজিট করতে 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top