শীতে শুষ্ক ত্বকের যত্নে ঘরোয়া উপায়

MOHAMMAD SABBIR
0

শীতে শুষ্ক ত্বকের যত্নে ঘরোয়া উপায়

শীতকাল মানেই শুষ্ক বাতাস, রুক্ষ প্রকৃতি এবং ত্বকের হাজারো সমস্যা। তাপমাত্রা কমার সাথে সাথে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের ত্বকে। ত্বক হয়ে ওঠে খসখসে, নিষ্প্রাণ এবং অনেক সময় ফেটে গিয়ে রক্ত পড়ার মতো সমস্যাও দেখা দেয়। তাই এই সময়ে প্রয়োজন বাড়তি যত্ন। অনেকেই বাজারচলতি কেমিক্যালযুক্ত লোশনের বদলে 
শীতে ত্বকের যত্নে ঘরোয়া উপায় খুঁজতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব কীভাবে খুব সাধারণ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে শীতেও ত্বককে মাখনের মতো কোমল রাখা যায়। এখানে আমরা ত্বকের যত্নে তিসির ব্যবহারসজনে পাতার উপকারিতা এবং তৈলাক্ত ত্বকের যত্নে কফি বা মসুর ডাল কীভাবে কাজ করে—তা নিয়ে বিস্তারিত জানাব।

শীতে শুষ্ক ত্বকের যত্নে ঘরোয়া উপায় কেন সেরা?

বাজারের দামী ময়েশ্চারাইজারগুলো অনেক সময় সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল শুষে নিতে পারে। কিন্তু শীতে শুষ্ক ত্বকের যত্নে ঘরোয়া উপায় গুলো সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মুক্ত। রান্নাঘরের সাধারণ উপাদান দিয়েই আপনি ত্বকের গভীর থেকে পুষ্টি যোগাতে পারেন। ঘরোয়া উপাদানগুলো ত্বকের পিএইচ (pH) ব্যালেন্স ঠিক রাখে এবং দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতা প্রদান করে।


শীতে ত্বকের যত্নে অলিভ অয়েল এবং প্রাকৃতিক ক্রিমের ব্যবহার

শীতের রুক্ষতা দূর করতে তেলের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে গোসলের পরে বা রাতে ঘুমানোর আগে তেলের ব্যবহার ত্বককে পুনরুজ্জীবিত করে।

১. শীতে ত্বকের যত্নে অলিভ অয়েল

অলিভ অয়েল বা জলপাই তেল হলো প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট।

  • ব্যবহারবিধি: গোসলের পর শরীর সামান্য ভেজা থাকা অবস্থায় সারা শরীরে অলিভ অয়েল ম্যাসাজ করুন। এটি লোশনের চেয়ে অনেক গুণ বেশি সময় ত্বককে আর্দ্র রাখে। মুখের শুষ্কতা দূর করতে রাতে কয়েক ফোটা এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল মুখে ম্যাসাজ করে ঘুমান।

২. শীতে ত্বকের যত্নে ক্রিম (ঘরোয়া)

আপনি চাইলে ঘরেই প্রাকৃতিক ক্রিম বানিয়ে নিতে পারেন।

  • পদ্ধতি: শিয়া বাটার (Shea Butter), নারিকেল তেল এবং আমন্ড অয়েল একসাথে মিশিয়ে একটি কাঁচের বয়ামে রাখুন। এটি শীতে ত্বকের যত্নে ক্রিম হিসেবে বাজারের যেকোনো নামিদামি ব্র্যান্ডের চেয়ে ভালো কাজ করে। এটি ত্বককে ফাটা থেকে রক্ষা করে এবং উজ্জ্বলতা বাড়ায়।


অপ্রচলিত কিন্তু কার্যকরী: তিসি, ভাতের মাড় ও সজনে পাতা

আমরা অনেকেই জানি না যে আমাদের হাতের কাছেই এমন কিছু উপাদান আছে যা ত্বকের জন্য জাদুকরী। চলুন জেনে নিই ত্বকের যত্নে তিসির ব্যবহারভাতের মাড় এবং সজনে পাতার গুণাগুণ।

৩. ত্বকের যত্নে তিসির ব্যবহার (Flaxseed)

তিসি বা ফ্লাক্সসিডকে বলা হয় প্রাকৃতিক বোটক্স। এতে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের বলিরেখা দূর করে এবং ত্বক টানটান রাখে।

  • তিসির জেল তৈরি: ১ কাপ পানিতে ২ টেবিল চামচ তিসি দিয়ে জ্বাল দিন। পানি আঠালো জেলের মতো হয়ে এলে নামিয়ে ছেঁকে নিন। এই জেলটি মুখে লাগিয়ে শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, তারপর ধুয়ে ফেলুন। এটি শীতে ত্বককে হাইড্রেটেড রাখে এবং গ্লো বাড়ায়।

৪. ত্বকের যত্নে ভাতের মাড়ের উপকারিতা

ভাতের মাড় বা Rice Water কোরিয়ান এবং জাপানিজ স্কিন কেয়ারের প্রধান গোপন অস্ত্র।

  • উপকারিতা: ভাতের মাড়ে রয়েছে ভিটামিন বি, সি এবং ই। এটি প্রাকৃতিক টোনার হিসেবে কাজ করে। এটি ত্বকের পোড়া ভাব দূর করে এবং ত্বককে নরম করে।

  • ব্যবহার: ভাতের মাড় ঠান্ডা করে তুলোর সাহায্যে মুখে লাগান। ১০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহারে ত্বক উজ্জ্বল ও মসৃণ হবে।

৫. ত্বকের যত্নে সজনে পাতার উপকারিতা

সজনে পাতাকে বলা হয় 'মিরাকল হার্ব'। এতে কমলার চেয়ে ৭ গুণ বেশি ভিটামিন সি এবং দুধের চেয়ে ৪ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম রয়েছে।

  • প্যাক: সজনে পাতা বেটে বা এর গুঁড়া মধুর সাথে মিশিয়ে মুখে লাগান। এটি ত্বকের ব্রণ দূর করতে এবং শীতে ত্বককে সজীব রাখতে সহায়তা করে। ত্বকের যত্নে সজনে পাতার উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না, এটি অ্যান্টি-এজিং হিসেবেও দারুণ কাজ করে।


শীতে তৈলাক্ত ত্বকের যত্ন: কফি ও মসুর ডাল

অনেকে ভাবেন শীতে তৈলাক্ত ত্বকের কোনো যত্ন লাগে না। এটি ভুল ধারণা। শীতে তৈলাক্ত ত্বকও ডিহাইড্রেটেড হতে পারে। তবে এর যত্নের পদ্ধতি একটু ভিন্ন।

৬. তৈলাক্ত ত্বকের যত্নে কফি

কফি একটি চমৎকার এক্সফোলিয়েটর বা স্ক্রাব। শীতে ত্বকের উপরে মরা চামড়া জমে ত্বক কালো দেখায়।

  • ব্যবহারবিধি: ১ চামচ কফি গুঁড়ার সাথে ১ চামচ টক দই মিশিয়ে মুখে আলতো করে ঘষুন। তৈলাক্ত ত্বকের যত্নে কফি খুব ভালো কাজ করে কারণ এটি ত্বকের অতিরিক্ত তেল দূর করে কিন্তু ত্বককে একেবারে শুষ্ক করে না। এটি রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে ত্বককে উজ্জ্বল করে।

৭. তৈলাক্ত ত্বকের যত্নে মসুর ডাল

মসুর ডাল ত্বক পরিষ্কার করতে এবং দাগ দূর করতে অনন্য।

  • প্যাক: মসুর ডাল ভিজিয়ে রেখে বেটে নিন। এর সাথে সামান্য কাঁচা দুধ মিশিয়ে মুখে লাগান। এটি ত্বককে গভীর থেকে পরিষ্কার করে এবং তৈলাক্ত ভাব নিয়ন্ত্রণ করে আর্দ্রতা বজায় রাখে। তৈলাক্ত ত্বকের যত্নে মসুর ডাল ও দুধের মিশ্রণ শীতে কালচে ভাব দূর করতে খুব কার্যকরী।

ত্বকের যত্নে ঘরোয়া টিপস

কেবল প্যাক লাগালেই হবে না, ত্বকের যত্নে ঘরোয়া টিপস হিসেবে কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি:

হাইড্রেটেড থাকুন: শীতে পানি পিপাসা কম পায়, কিন্তু ত্বক ভালো রাখতে দিনে অন্তত ৮ গ্লাস পানি পান করতে হবে।

অতিরিক্ত গরম পানি বর্জন: গোসলে খুব বেশি গরম পানি ব্যবহার করবেন না। এটি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে ফেলে। কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন।

ঠোঁটের যত্ন: ঠোঁট ফাটলে জিহ্বা দিয়ে ভেজাবেন না। এতে ঠোঁট আরও বেশি ফাটে। নারিকেল তেল বা ঘি ব্যবহার করুন।

সানস্ক্রিন:
 শীতে রোদ মিষ্টি লাগলেও সূর্যের ইউভি রশ্নি ত্বকের ক্ষতি করে। তাই বাইরে যাওয়ার আগে সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।

সতর্কতা

প্রাকৃতিক উপাদান নিরাপদ হলেও কিছু সতর্কতা মেনে চলা প্রয়োজন:

প্যাচ টেস্ট (Patch Test):
 সজনে পাতা, তিসি বা অন্য যেকোনো উপাদান ব্যবহারের আগে কানের নিচে বা হাতে একটু লাগিয়ে দেখুন কোনো অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হয় কিনা।

স্ক্রাবিংয়ে সাবধানতা:
 শীতে ত্বক নাজুক থাকে। তাই কফি বা চালের গুঁড়া দিয়ে স্ক্রাব করার সময় খুব জোরে ঘষবেন না, এতে চামড়া ছিলে যেতে পারে।

মেয়াদ:
 ভাতের মাড় বা ঘরে তৈরি ক্রিম ফ্রিজে সংরক্ষণ করুন এবং ৩-৪ দিনের বেশি ব্যবহার করবেন না। বাসি উপাদান ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।

শীতকাল মানেই ত্বকের জৌলুস হারিয়ে যাওয়া নয়। সঠিক যত্ন নিলে এই সময়েও আপনার ত্বক থাকতে পারে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। ওপরের আলোচনায় আমরা শীতে শুষ্ক ত্বকের যত্নে ঘরোয়া উপায়ত্বকের যত্নে তিসির ব্যবহার, এবং তৈলাক্ত ত্বকের যত্নে মসুর ডাল ও কফির মতো সহজলভ্য উপাদানের কার্যকারিতা তুলে ধরেছি। দামী প্রসাধনীর পেছনে না ছুটে প্রকৃতির ভান্ডারে থাকা এই উপাদানগুলো ব্যবহার করে দেখুন। নিয়মিত পরিচর্যা এবং ত্বকের যত্নে ঘরোয়া টিপস গুলো মেনে চললে এই শীতেও আপনার ত্বক থাকবে কোমল, মসৃণ এবং স্বাস্থ্যোজ্জ্বল। মনে রাখবেন, সুস্থ ত্বকই সৌন্দর্যের মূল চাবিকাঠি।

আরো দেখুন: ঘাড় ও মাথা ব্যথার কারণ ও প্রতিকার | ১০টি ঔষধের

আমাদের অন্য একটি সাইট ভিজিট করতে .

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top